আফগানদের যে কারণে কেউ হারাতে পারবে না |




বলা হয়, জয় করা সম্ভব হলেও আফগানিস্তান দখলে রাখা কঠিন। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেশটির ভূ-প্রকৃতি। জনবসতির বিচ্ছিন্নতা ও জাতিগত ভিন্নতাও অন্যতম কারণ। মার্কিনিদের আগে সোভিয়েত ও ব্রিটিশদের নাজেহাল হতে হয়েছে আফগানিস্তানে। এর আগের ইতিহাসেও আফগানিস্তান জয়ের নজির পাওয়া যায় না। লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা পাহাড়ি স্থলবেষ্টিত একটি দেশ আফগানিস্তান। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয় দেশটিকে। আফগানিস্তানের পূর্বে ও দক্ষিণে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর-পূর্বে চীনের অবস্থান। আফগানিস্তান শব্দের অর্থ আফগান (পশতুন) জাতির দেশ। দেশটির উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম ও দক্ষিণের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো মূলত মরুভূমি ও পর্বতশ্রেণি। উত্তর-পূর্বে দেশটি ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে হিমবাহ-আবৃত পশ্চিম হিমালয়ের হিন্দুকুশ পর্বতের সঙ্গে মিশেছে। আমু দরিয়া নদী ও এর পাঞ্জ নামের উপ-নদী দেশটির উত্তর সীমান্ত নির্ধারণ করেছে।

আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক এলাকার উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে দুই হাজার মিটার বা তার চেয়ে উঁচুতে। বছরের প্রায় পুরো সময় ছোট ছোট হিমবাহ ও তুষার ক্ষেত্র দেখা যায়। উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত ৭,৪৯২ মিটার উচ্চতার নওশাক আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ও সর্বোচ্চ বিন্দু। এটি পাকিস্তানের তিরিচ মির পর্বতশৃঙ্গের একটি নিচু পার্শ্বশাখা। পর্বতটি আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বে হিন্দুকুশ পর্বতমালার অংশ, যেটি আবার পামির মালভূমির দক্ষিণে অবস্থিত। হিন্দুকুশ থেকে অন্যান্য নিচু পর্বতসারি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে প্রধান শাখাটি দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রসারিত হয়ে পশ্চিমের ইরান সীমান্ত পর্যন্ত চলে গেছে। এই নিচু পর্বতমালাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. পারোপামিসুস পর্বতমালা এটি উত্তর আফগানিস্তান অতিক্রম করেছে এবং ২. সফেদ কোহ পর্বতমালা এটি পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব সীমান্ত তৈরি করেছে। সফেদ কোহ-তেই রয়েছে বিখ্যাত খাইবার গিরিপথ, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ। অপেক্ষাকৃত নিম্নভূমিগুলো দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমে অবস্থিত। এদের মধ্যে রয়েছে উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের হেরাত-ফেরা নিম্নভূমি, দক্ষিণ-পশ্চিমের সিস্তান ও হেলমন্দ নদী অববাহিকা এবং দক্ষিণের রিগেস্তান মরুভূমি। সিস্তান অববাহিকাটি বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক এলাকার একটি। আফগানিস্তানের সর্বনিম্ন বিন্দু জওজান প্রদেশের আমু নদীর তীরে অবস্থিত, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫৮ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট।নদী উপত্যকা ও কিছু ভূগর্ভস্থ পানিসমৃদ্ধ নিম্নভূমি ছাড়া অন্য কোথাও কৃষিকাজ হয় না বললেই চলে। মাত্র ১২ শতাংশ এলাকা পশু চারণযোগ্য। দেশটির মাত্র ১ শতাংশ এলাকা বনাঞ্চল এবং এগুলো মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে অবস্থিত। যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের কারণে এখানকার বনভূমি দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আফগানিস্তান এত পর্বতময় যে এগুলোর মধ্যকার রাস্তাগুলো দেশটির বাণিজ্য ও বাইরের আক্রমণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার কুশান পাসের ভেতর দিয়ে এসে আফগানিস্তান এবং খাইবার পাস দিয়ে বের হয়ে ভারত আক্রমণ করেন। এই একই পথ ধরে মুঘল সম্রাট বাবর ১৫০০ শতকে এসে আফগানিস্তান ও ভারত দুই-ই জয় করেন। অন্যদিকে সোভিয়েতরা সালাং পাস ও কেন্দ্রীয় হিন্দুকুশে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান দখল করে।খাইবার গিরিপথ

খাইবার একটি পার্বত্য গিরিপথ। এর উচ্চতা ১,০৭০ মিটার। এটি স্পিন ঘার পর্বতের উত্তরাংশকে ছেদ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। গিরিপথটি প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং এটি পৃথিবীতে ব্যবহৃত প্রাচীনতম গিরিপথগুলোর মধ্যে অন্যতম। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানও ছিল এই গিরিপথ। এর সীমানা পাকিস্তানের ৫ কিলোমিটার ভেতরে লান্ডি কোটাল পর্যন্ত।

নদী ও জলাশয়

আফগানিস্তানের বেশির ভাগ প্রধান নদীর উৎপত্তি পার্বত্য জলধারা থেকে। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুমে বেশির ভাগ নদী শীর্ণ ধারায় প্রবাহিত হয়। বসন্তে পর্বতের বরফ গলা শুরু হলে এগুলোতে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। বেশির ভাগ নদীই হ্রদ, জলাভূমি কিংবা নোনাভূমিতে পতিত হয়। এদের মধ্যে কাবুল নদী ব্যতিক্রম। এটি প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানের সিন্ধু নদের সঙ্গে মেশে, যা পরে ভারত মহাসাগরে গিয়ে পতিত হয়। দেশটির একমাত্র নৌপরিবহনযোগ্য নদীটি হলো উত্তর সীমান্তের আমু দরিয়া। তবে ফেরি নৌকার সাহায্যে অন্যান্য নদীর গভীর এলাকায় যাওয়া যায়। পামির মালভূমি থেকে উৎপন্ন পাঞ্জ ও বখ্শ উপ-নদী থেকে পানি আমু দরিয়ায় গিয়ে মেশে। হারিরুদ নদী মধ্য আফগানিস্তানে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ইরানের সঙ্গে সীমান্ত সৃষ্টি করেছে। হারিরুদের পানি হেরাত অঞ্চলে সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়। হেলমান্দ নদী কেন্দ্রীয় হিন্দুকুশ পর্বতমালায় উৎপন্ন হয়ে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ইরানে প্রবেশ করেছে। এই নদীটি ব্যাপকভাবে সেচকাজে ব্যবহৃত হয়, তবে ইদানীং এর পানিতে খনিজ লবণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় শস্যে পানি দেওয়ার কাজে এর উপযোগিতা কমে এসেছে।

আফগানিস্তানের হ্রদগুলো সংখ্যায় ও আকারে ছোট। এদের মধ্যে আছে তাজিকিস্তান সীমান্তে ওয়াখান করিডরে অবস্থিত জার্কোল হ্রদ, বাদাখশানে অবস্থিত শিভেহ হ্রদ এবং গজনির দক্ষিণে অবস্থিত লবণাক্ত হ্রদ ইস্তাদেহ-ইয়ে মোকোর। সিস্তান হ্রদ বা হামুন-ই-হেলমান্দ হেলমান্দ নদীর শেষসীমায় লবণাক্ত জলা এলাকায় ইরানের সীমান্তে অবস্থিত। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু কিছু নদীতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। এদের মধ্যে আছে কাবুল শহরের পূর্বে কাবুল নদীর ওপরে নির্মিত সারোবি ও নাগলু বাঁধ, হেলমান্দ নদীর ওপর নির্মিত কাজাকি জলাধার এবং কান্দাহার শহরের কাছে হেলমান্দ নদীর একটি উপ-নদীর ওপর নির্মিত আর্গান্দাব বাঁধ।

রাজনৈতিক উত্থান-পতন

আফগানিস্তানের বর্তমান সীমারেখা ১৮০০ শতকের শেষ দিকে দেশটিকে জার-শাসিত রুশ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী ‘বাফার’ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়। এই কৃত্রিম সীমান্ত বহু জাতির ঐতিহ্যবাহী বাসস্থলকে ভাগ করে ফেলে, যাদের মধ্যে আছে পশতু, তাজিক, কাজাক, তুর্কি, হাজারা ও উজবেক। এ বিভাজিতরা বহু যুদ্ধের মাধ্যমে আফগানিস্তানে জাতিগত বিদ্বেষ জিইয়ে রাখে। এমনকি, এখনো আফগানিস্তানের কোথাও কোথাও জাতীয়তা ও আত্মীয়তার বন্ধনকে রাষ্ট্রীয় বন্ধনের চেয়ে বড় হিসেবে গণ্য করা হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আফগানিস্তানে এ পর্যন্ত একটিমাত্র সরকারি আদমশুমারি সম্পন্ন হয়েছে, ১৯৭৯ সালে। সেই তথ্য অনুযায়ী আফগানিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় দেড় কোটি। ২০০৬ সালে এই জনসংখ্যা ৩ কোটি ১০ লাখে গিয়ে পৌঁছেছে বলে ধারণা করে হয়। বর্তমানে জনসংখ্যা চার কোটির কম-বেশি। এদের বিরাট অংশ শরণার্থী বা রিফিউজি।

১৯৭৯ সালের সোভিয়েত আক্রমণের ফলে অনেক আফগান দেশের বাইরে উদ্বাস্তু হিসেবে পাড়ি জমান। এদের মধ্যে ৩০ লাখ যায় পাকিস্তানে এবং প্রায় ১৫ লাখ চলে যায় ইরানে। এ ছাড়া প্রায় দেড় লাখ আফগান স্থায়ীভাবে বিদেশে পাড়ি জমায় এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে বসতি স্থাপন করে।

২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর অনেক উদ্বাস্তু দেশে ফেরত আসতে থাকে। ২০০২ সাল নাগাদ প্রায় ১৫ লাখ উদ্বাস্তু পাকিস্তান থেকে এবং প্রায় ৪ লাখ উদ্বাস্তু ইরান থেকে ফেরত আসে। তবে পুনর্বাসন আফগান সরকারের জন্য সংকটের সৃষ্টি করেছে। বহু উদ্বাস্তু স্থলমাইন-সংকুল, বিমান-আক্রমণে বিধ্বস্ত ও পানির অভাবগ্রস্ত খরা এলাকায় বাস করছে। তদুপরি, দীর্ঘ ও লাগাতার সংঘাতের কারণে আফগানিস্তানে উদ্বাস্তুকরণ অব্যাহত গতিতে চলছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ এবং এশিয়ার সর্ববৃহৎ শরণার্থী আফগানরা।

আফগানিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধরা হয় ২.৬৭ শতাংশ। আফগানিস্তানের শিশুমৃত্যুর হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। হাজারে ১৬০টি শিশু জন্মে সেখানেই মারা যায়। এখানে মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৪৩ বছর। আফগানিস্তানের প্রায় ৭৭ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। শহরবাসীর অর্ধেক থাকে রাজধানী কাবুলে।

১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র হিসেবে আফগানিস্তানের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৮ সালে আরেকটি অভ্যুত্থানে নিষিদ্ধ বামপন্থি দল (পিডিপিএ) ক্ষমতায় আসে। এই দলের সাম্যবাদী শাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে। তবে ইসলামবিদ্রোহী মুজাহিদিনরা এই শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে।

পিডিপিএকে সমর্থন করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে একটি পূর্ণমাত্রার আক্রমণ পরিচালনা করে। কিন্তু আফগানদের সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে কিছুদিন পরে একজন মধ্যপন্থি পিডিপিএ নেতাকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়, যাতে মুজাহিদিনরা শান্ত হয়। কিন্তু মুজাহিদিনেরা সোভিয়েত দখলের বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা অব্যাহত রাখে। পিডিপিএ সরকার সোভিয়েত সরকারের কাছ থেকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পেত, অন্যদিকে মুজাহিদিনরা যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও কয়েকটি মুসলিম দেশ থেকে সাহায্য পেত।

১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানের পার্বত্য কান্দাহারে গঠিত তালেবান গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে এবং পাঁচ বছর পর ২০০১ সালে আমেরিকানদের দ্বারা অপসারিত হয়। তারপর বিগত কুড়ি বছর প্রতিরোধের পর ২০২১ সালে পুনর্বার তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে, যা সেখানে নতুন সংকটের সূচনা ঘটিয়েছে।

কেন জয় পাওয়া কঠিন

দুই শতক আগে গ্রিকরা আফগানিস্তানের পর্বতগুলোর নাম দিয়েছিল ককেশাস (পৃথিবীর শেষ)। সত্যি বলতে হিন্দুকুশ নামে পরিচিত এই পর্বতগুলো শুধু যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তা-ই নয়, এই পর্বতগুলোকে তুলনা করা যায় গাছের পাতার সঙ্গে। পাতার মধ্যে যেমন অনেক ছোট ছোট শাখা থাকে এবং সেগুলো মাঝে একটি সীমানা দ্বারা নির্ধারিত হয়। ঠিক তেমনই এই পর্বতগুলো আফগানিস্তানের জীবন ও মরণের মধ্যে গড়ে দিয়েছে সম্পর্ক।

আফগানরা এসব পর্বতের মধ্যেই বাস করে। এমনকি শস্য উৎপাদন ও পশুপালনও হয় এখানেই। মাত্র ২০ শতাংশ জমি চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়। আফগানিস্তানের প্রায় পুরো এলাকাই শুকনো ও মুক্ত এলাকা। লম্বা পর্বত ও শুকনো মরুভূমি দ্বারা দেশটি আবৃত। গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক এবং শীতকালে প্রচণ্ড ঠা-া থাকে। উত্তরের উপত্যকায় গ্রীষ্মে ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। শীতকালের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দুকুশ ও আশপাশের দুই হাজার মিটার উচ্চতার অঞ্চলে তাপমাত্রা হিমাঙ্ক থেকে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিচে নেমে পড়ে। অন্যান্য উঁচু এলাকায় উচ্চতাভেদে তাপমাত্রার তারতম্য ঘটে। এমনকি একই দিনে তাপমাত্রার ব্যাপক তারতম্য ঘটতে পারে। বরফজমা ভোর থেকে দুপুরে ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা ওঠা বিচিত্র নয়। অক্টোবর ও এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টিপাত হয়। মরুভূমি এলাকায় বছরে চার ইঞ্চিরও কম বৃষ্টি পড়ে। পশ্চিমের হাওয়া মাঝে মাঝে বিরাট ধূলিঝড়ের সৃষ্টি করে আর সূর্যের উত্তাপে স্থানীয় ঘূর্ণিবায়ু ওঠাও সাধারণ ঘটনা। পর্বতের জলধারার মধ্য দিয়ে অনেক নদী বয়ে গেছে। বরফগলা ও বৃষ্টির পানি হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে প্রবাহিত হয়ে ছোট ছোট এলাকায় যায়। এ কারণে কখনো এই পানি সমুদ্রে যায় না।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ মারা যায়। এই ঘটনার এক মাস পর তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটিশ ও আমেরিকান সৈন্যরা তালেবানদের ওপর বোমা হামলা চালানো শুরু করে। এ যুদ্ধে সহায়তা দেয় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্স।

প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে যুদ্ধ শুরু করলেও আমেরিকার জন্য যুদ্ধে টিকে থাকা বেশ কঠিন ছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল পর্বত ও উঁচু এলাকা। আফগানিস্তানে তালেবান ও মার্কিন যুদ্ধ নিঃসন্দেহে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধ। এ যুদ্ধে কেউই হাল ছাড়তে রাজি ছিল না। দেশগুলো সৈন্য প্রত্যাহারের চেষ্টা করলেও উল্টো আরও সেনা আফগানিস্তানে প্রবেশ করাতে হয়েছে। মার্কিনিরা আফগানিস্তান ত্যাগ করায় আফগানিস্তানের দখল এখন তালেবানের হাতে। দীর্ঘ ২০ বছরের এই যুদ্ধই শুধু নয়, এর আগেও এখানে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সেখানেও পুরোপুরি এই দেশ দখল করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু কেন আফগানিস্তানের যুদ্ধে জয় পাওয়া সম্ভব নয়? এর উত্তর আফগানিস্তানের অগণিত পাহাড় ও পর্বত। এসব পর্বত শুধু একজন নয়, সংখ্যায় বেশি হলেও সবাইকে আড়াল করে রাখতে সক্ষম। যার কারণে এসব পর্বতের পেছনে কেউ লুকালে তাকে সহজে দেখা যায় না। এ ছাড়া এখানকার পরিবেশের সঙ্গে বাইরের দেশ থেকে আসা মানুষদের টিকে থাকা অসম্ভব। উঁচু পাহাড়ে ওঠা নামা, লুকিয়ে থাকা, সমতলে ফিরে আসা, আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ সবকিছুতেই আফগানরা এগিয়ে।

এই সুযোগটাই পুরোপুরি নিয়েছে তালেবান। দেশটি সম্পর্কে তাদের ধারণা খুব ভালো থাকায় কোথায় কোন পর্বতের অবস্থান সেটি তারা সহজেই জানে। এ ছাড়া দেশের কোন অংশে লুকালে অন্য কেউ তাদের খুঁজে পাবে না তাও তাদের নখদর্পণে। একজন মার্কিন নাগরিক এখানে এসে যতটুকু না জানতে পারে, তার সবটুকুই তাদের আগে থেকে জানা। পরিস্থিতি যতই প্রতিকূলে থাকুক না কেন, অল্প সময়েই তারা সেটি অনুকূলে নিয়ে নেয়। আর এটাই তাদের যুদ্ধজয়ের অন্যতম কারণ। ইতিহাসের আগের যুদ্ধগুলোতেও একই কারণে বারবার জয় হয়েছে আফগানদেরই।