কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ), যা বম পার্টি নামেও পরিচিতহলো বাংলাদেশের পার্বত্য
চট্টগ্রামে সক্রিয় একটি নিষিদ্ধ জাতিগত সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী
সংগঠন, যা চট্টগ্রাম
বিভাগের রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি
জেলায় হত্যা,
লুটপাট, মুক্তি পণ দাবিসহ একাধিক সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত রয়েছে। ২০১৭ সালে নাথান
বম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কেএনএফ রাঙামাটি ও বান্দরবান
জেলার নয়টি উপজেলা নিয়ে বম, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং জনগণের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বাংলাদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট মিয়ানমারের কাচিন
রাজ্য থেকে অস্ত্র পায়এবং কারেন
বিদ্রোহীর সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে।এর সশস্ত্র
শাখার নাম কুকি-চিন ন্যাশনাল
আর্মি (কেএনএ)।
ইতিহাস
পার্বত্য
চট্টগ্রামের এই মানচিত্রে লাল রঙের এলাকাগুলো প্রস্তাবিত কুকি-চিন রাষ্ট্রকে নির্দেশ করে। কেএনএফ-এর দাবিকৃত অধিকাংশ অঞ্চলই রাঙামাটি ও বান্দরবান
জেলার ভিতরে পড়ে।
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২০১৭ সালে বাংলাদেশে বম জনগণের সদস্যদের দ্বারা দুই হাজার কর্মী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বম সম্প্রদায় বেশিরভাগ খ্রিস্টান এবং পার্বত্য
চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ তোলে। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হলেন ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার স্নাতক নাথান বম। তিনি পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাথে জড়িত ছিলেন এবং ২০০৮ সালে কুকি-চিন জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং কুকি-চিন জাতীয় স্বেচ্ছাসেবকদের নামকরণ করেন। কুকি-চিন জাতীয় স্বেচ্ছাসেবকরা কুকি-চিন জাতীয় ফ্রন্টে পরিণত হবে।কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের চিফ অফ স্টাফ ভানচুন লিয়ান মাস্টার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক।
২০২২ সালের জুন মাসে, কুকি-চিন জাতীয় ফ্রন্ট রাঙ্গামাটি
জেলার বেলাইছড়ি
উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করে। অক্টোবরে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে বান্দরবান জেলা থেকে পর্যটকদের ফেরত পাঠানো হয়।২০২২ সালের নভেম্বরে,
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের বিরুদ্ধে একটি অভিযান শুরু করে যার ফলে ২৭০ জন কুকি লোক ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেয়।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, র্যাপিড
অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন দিনব্যাপী বন্দুকযুদ্ধের পর জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়ার ১৭ জন কর্মী এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ০৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তারা অন্যান্য অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জামের সাথে একে -২২ রাইফেলও উদ্ধার করেছে।জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া অস্ত্রের জন্য কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে ১.৭ মিলিয়ন দিয়েছে।২০২৩ সালের জানুয়ারীর মধ্যে,
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ১৪ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছিল।
কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি
|
কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি |
|
|
নেতা |
নাথান বম |
|
চিফ অফ স্টাফ |
ভানচুন লিয়ান মাস্টার |
|
প্রতিষ্ঠা |
২০১৭ |
|
অপারেশনের তারিখ |
২০১৭ – বর্তমান |
|
দেশ |
|
|
আনুগত্য |
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট |
|
উদ্দেশ্য |
রাঙামাটি ও বান্দরবান
জেলার নয়টি উপজেলা নিয়ে পৃথক বম রাষ্ট্র সৃষ্টি করা। |
|
সক্রিয়তার অঞ্চল |
পার্বত্য
চট্টগ্রাম |
|
অবস্থা |
সক্রিয় |
|
আকার |
শতাধিক |
|
রাজস্বের উৎস |
সন্ত্রাসবাদ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি। |
|
মিত্র |
|
|
বিপক্ষ |
|
|
খণ্ডযুদ্ধ ও যুদ্ধ |
পার্বত্য
চট্টগ্রাম সংঘাত (২০১৭ সাল থেকে) |
কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) হলো কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রান্টের সশস্ত্র শাখা।এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামী জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়াকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। আর্থিক কারণে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
২০২৩ সালের ১১ থেকে ১৭ জানুয়ারী পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসন জেলার নিরাপত্তা বাহিনীর কেএনএ বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে জেলার পর্যটকদের নিষিদ্ধ করেছিল।নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধের পর ৩০ জানুয়ারী রুমা
উপজেলায় কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মির সদস্যদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়।র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির মধ্যে আরেকটি বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে।১২ মার্চ আসাম রাইফেলস মিরোজামে কুকি-চিন জাতীয় সেনাবাহিনীর দুই সদস্যকে আটক করে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি কনভয়কে আক্রমণ করেছিল যেটি পার্বত্য চট্টগ্রামে গর্ভবতী মায়েদের জন্য চিকিৎসা কনভয়কে এসকর্ট করছিল। অতর্কিত হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন ও দুই সেনা আহত হন। কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি থানচি সড়ক নির্মাণকারী ১২ জন শ্রমিককে অপহরণ করে এবং মুক্তিপণ পেয়ে তাদের কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়।এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্টকেও অপহরণ করে,
যিনি রাস্তা নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছিলেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে, বান্দরবান
জেলার রোয়াংছড়ি
উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ডেমোক্রেটিক), ইউনাইটেড
পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের একটি অংশ এবং কুকি-চিন জাতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে আটজন নিহত হয়।
২০২৩ সা১৭ মে বান্দরবানের রুমা উপজেলার অন্তর্গত সুংসুংপাড়ায় কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর টহল টিমের ওপর গুলি বর্ষণ করে। এতে সেনাবাহিনীর দুই জন সদস্য নিহত হয়। এছাড়া আরও দুই জন কর্মকর্তা আহত হয়।
সন্ত্রাসী কার্যকলাপ
- ২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল রুমা উপজেলার বড়থলি পাড়া আর্মি ক্যাম্পের আওতাধীন পলি পাংশা পাড়ার মধ্যবর্তী স্থানের যাত্রী ছাউনি এলাকায় কেএনএফ এর গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্পোরাল রফিকুল ইসলাম (৩৭)।
- ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল রাতে এ গোষ্ঠীটির কিছু সদস্য রুমায় অবস্থিত সোনালী
ব্যাংকের শাখায় ডাকাতি করে প্রায় দেড় কোটি টাকা লুট করে। এর পরের দিন দুপুরে পুনরায় থানচিতে কৃষি এবং সোনালী
ব্যাংকের দুটি শাখায় ডাকাতির চেষ্টা চালায়। ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ছাড়াও সোনালি ব্যাংকের ম্যানেজারকে অপহরণ, আনসার ও পুলিশ বাহিনীর প্রায় ১৪টি অস্ত্র লুট করে হামলাকারীরা। পরবর্তীতে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিয়মে ম্যানেজারকে মুক্তি দেওয়া হয়।
- ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এর হুমকির মুখে বান্দরবানের থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ি
উপজেলায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
- ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কেএনএফ সদস্যরা চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় উহ্লাচিং মার্মাকে গুলি করে আহত অবস্থায় ফেলে যায়।
- ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই রুমা
উপজেলা থেকে সুজন চৌধুরী (৪৫) নামে ওই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে কেএনএফ।
- ২০২৩ সালে ১৬ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ছিলোপিপাড়া টেম্পোরারি অপারেটিং বেজ থেকে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার স্যালাইন বিতরণের জন্য পাইনুমপাড়া এলাকায় যাত্রাপথে ক্যাম্প থেকে আনুমানিক ৪০০ মিটার দূরে কেএনএফ সন্ত্রাসীদের বিক্ষিপ্তভাবে পুঁতে রাখা আইইডি বিস্ফোরণের শিকার হন। এ সময় দুজন সৈনিক শরীরের বিভিন্ন অংশে স্প্লিন্টারের আঘাতে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে আহত সৈনিক মোন্নাফ হোসেন (২১) চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন
- ২০২৩ সালের ১ জুন রুমা উপজেলার ছিলোপিপাড়া এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল কেএনএফ এর গোপন সদর দপ্তর ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প দখল করে। এসময় কেএনএফ সদস্যরা পালিয়ে গেলেও তাদের বিক্ষিপ্তভাবে পুঁতে রাখা আইইডি বিস্ফোরিত হয়ে সৈনিক তুজাম (৩০) মারাত্মক আহত হন যিনি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
- ২০২৩ সালের ১৬ মে বান্দরবানের রুমা উপজেলার সুংসুংপাড়া সেনা ক্যাম্পের আওতাধীন জারুলছড়িপাড়ার কাছাকাছি ছড়ার কাছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের উপর কেএনএফ সদস্যরা আইইডি বোমা বিস্ফোরণ ও অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। এতে আহত দুই সৈনিক মো: আলতাফ আহমদ ও মো: তৌহিদ চিকিৎসারত অবস্থায় ১৭ই মে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর আরো দুজন কর্মকর্তা আহত হন
- ২০২৩ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বান্দরবানের থানচি সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেসামরিক ঠিকাদার, মালামাল সরবরাহকারী এবং শ্রমিকদের নিকট থেকে দাবিকূত চাঁদা না পেয়ে ১২ জন শ্রমিককে অপহরণ করে কেএনএফ সদস্যরা। এদের মধ্যে সাতজন শ্রমিককে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিলেও পাঁচজন শ্রমিককে তাব়া জিম্মি করে রাখে যাদের মধ্যে একজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছিল। এ ঘটনার পরদিন ১২ মার্চ বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাতীয় শিশু দিবস-২০২৩ ও মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশে গমনকৃত দলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর টহল দলের উপর কেএনএফ সদস্যরা অতর্কিত গুলি বর্ষণ করলে সেনাবাহিনীর মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনায় আরও দুই সেনা সদস্য আহত হন।

.jpg)

0 Comments